আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ০২, ২০২১

অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের জাতিগোষ্ঠীগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করছে রাজপথের আন্দোলন

সেনাশাসন বিরোধী আন্দোলনকারীদের উপর সেনাবাহিনীর হামলার পর দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ বামারদের। সেনা নিপীড়নের ক্ষত কত গভীর হতে পারে, তা অনুধাবন করছেন তারা।

myanmar-yangon-protest-ethnic-flag-gettyimages-1231232518
মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর পতাকা ওড়াচ্ছেন অংশগ্রহণকারীরা। ছবি: সাই অং মেইন/ এএফপি

পয়লা ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা দখলের পর তাতমাদাও নামে পরিচিত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৫১০। আটক হয়েছে দুই হাজার ৫০০ জনেরও অধিক বিক্ষোভকারী। বামার সম্প্রদায় মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী। মিয়ানমারে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের বিষয়ে বামার সম্প্রদায় কখনোই সেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। কিন্তু, সম্প্রতি সামরিক জান্তার আগ্রাসী আচরণ বাড়তে থাকায় দেশটির বিভিন্ন সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করছেন বামাররা। সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতি নিপীড়নের বিরুদ্ধে এই উদাসীন আচরণের জন্য জনসম্মুখে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন অনেকেই। অভ্যুত্থানের আগে রেঙ্গুনে হোটেল মালিক ছিলেন বামার সম্প্রদায়ের তরুণ ইয়িন ইয়িন। এমনই এক বক্তৃতায় ক্ষমা প্রার্থনা করে তিনি বলেন, "আমরা কালানুক্রমে শিক্ষা পেয়েছি। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে গেছে। আমরা গভীরভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।"

বামার সম্প্রদায়ের অনেকেই তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকেও সরে আসছেন। আন্দোলনের শুরুতেই ১৯৮৮ সালের ছাত্র অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী প্রজন্মের আন্দোলনকারীদের মাঝে বিভাজন দেখা যায়। অনেকেই অং সান সুচি এবং নির্বাচিত কর্মকর্তাদের মুক্তির মাধ্যমে পুরনো শাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পক্ষে আন্দোলন করছেন। তবে, অন্য একটি দল ভিন্ন মত পোষণ করছে। জেনারেল স্ট্রাইক কমিটি অব ন্যাশনালিটিজের (জিএসসিএন) অধীনে সংগঠিত দলটি কেবল আটক নেতাদের মুক্তিতেই সন্তুষ্ট নন। পুরনো শাসন ব্যবস্থায় ফেরার বদলে তারা ২০০৮ সালের সেনাবাহিনী অনুমোদিত খসড়া সংবিধানের বিলুপ্তি চান। ফেডারেল শাসনের ভিত্তিতে নতুন একটি সংবিধান রচনার দাবি তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তরুণদের মাঝেও নতুন সংবিধান প্রণয়নের দাবি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। পুরনো বৈষম্য ঘুচিয়ে এক নতুন সাম্যবাদী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের দিকে ঝুঁকছেন তারা।

সেনা অভ্যুত্থানের আগে জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর সেনাবাহিনী কর্তৃক সহিংসতা এবং সরকারের নিপীড়ন নিয়ে বামারদের মাঝে জোরালো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা বিরোধী প্রচারণায় গুটিকয়েক সমাজকর্মী ব্যতীত দেশটির অধিকাংশ মানুষই সরকারকে সমর্থন দিয়েছেন। ২০১৮ সালে তাতমাদাওরা মিয়ানমারের কাচিন রাজ্যে সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপর বোমা হামলা চালায়। তখনও সুশীল সমাজ ব্যতীত অন্যদের বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামাতে দেখা যায়নি। এমনকি সরকার যখন রাখাইন এবং চীন রাজ্যে এক বছরেরও অধিক সময় ধরে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রাখে, তখনও জনমনে কোনো উদ্বেগ ছিল না।

তবে, সেনাশাসন বিরোধী আন্দোলনকারীদের উপর সেনাবাহিনীর হামলার পর দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে সংখ্যাগরিষ্ঠ বামারদের। সেনা নিপীড়নের ক্ষত কত গভীর হতে পারে, তা অনুধাবন করছেন তারা। ইয়িন ইয়িন বলেন, "অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা সবাই একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি। সারাদেশেই একই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে চলেছে। আমরা বার্মিজ, কাচিন না চীনা তা দিয়ে এখন আর কিছু যায় আসে না। যতদিন আমরা মিয়ানমারে আছি, আমাদের সকলের সমান অধিকার আছে। আমাদের একই ধরনের স্বাধীনতার প্রয়োজন। আর তাই ফেডারেল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।"

২০০৮ সালের সংবিধান অনুযায়ী, মিয়ানমারের সকল ভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ কেন্দ্রীয় সরকারের মালিকানাধীন। এসব ভূমি ব্যবহার কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন এবং নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত আইন প্রণয়নে সরকারের একচ্ছত্র অধিকার আছে। রাষ্ট্রপতি নিজে সাতটি জাতিগত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ দেন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংখ্যালঘুদের অপসারণের মাধ্যমে এসব রাজ্য এবং সেখানকার ব্যবহারযোগ্য সম্পদও অরক্ষণীয় হয়ে পড়ছে। ফলে, স্থানীয় সংখ্যালঘুরা উচ্ছেদের শিকার হচ্ছে। ফেডারেল ব্যবস্থা নির্ভর নতুন একটি সংবিধান প্রণয়ণের মধ্য দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব হবে। মেডিকেল শিক্ষার্থী ওয়েই নিন লে ফিউ বলেন, "কেবলমাত্র ক্ষমা প্রার্থনা যথেষ্ট নয়। আমাদের ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেজন্য ফেডারেল ব্যবস্থা প্রণয়ন সবথেকে জরুরি।"

১৯৪৭ সাল থেকেই জাতিগত সংখ্যালঘুরা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করে আসছে। যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের এগারো মাস আগে অং সান সুচির পিতা জেনারেল অং সান রাজ্যভিত্তিক স্বায়ত্ত্বশাসনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নেতাদের ইউনিয়ন অব বার্মায় যোগদানে প্রলুদ্ধ করেন। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন অং সান। পরবর্তীতে, স্বায়ত্ত্বশাসনের সেই প্রতিশ্রুতির আর পুনরুক্তি ঘটেনি। এদিকে, জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো স্বাধীনতার পর রাজ্য অধিকার আদায়ে লড়াই শুরু করে। তারপর তারা আর থামেনি। এই দ্বন্দ্বের জের ধরে লাখো মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা হয়। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নাগরিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রকাশ পায়।

সরকার এসব সশস্ত্র জাতিগত সংগঠনগুলোকে অবৈধ এবং জঙ্গি দল হিসেবে প্রচার করে। বামার সম্প্রদায়ের কাছে প্রোপাগান্ডা এবং ভ্রান্ত তথ্যের মাধ্যমে জাতিগত গোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা প্রচার করা হয়। ২০১১ সাল পর্যন্ত সেনাশাসনের অধীনে স্বাধীন গণমাধ্যমের অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। তবে, অং সান সুচির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) অধীনে গণমাধ্যম ব্যবস্থা কিছুটা হলেও পরিবর্তিত হয়। সরকার তবু রাখাইন রাজ্যসহ দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে গণমাধ্যমের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবেদনের দায়ে বহু সাংবাদিককে গ্রেপ্তার এবং হয়রানির শিকার হতে হয়। তাতমাদাওরাও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ভ্রান্ত তথ্য এবং বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রচার চালিয়ে যায়।

বামার সম্প্রদায় অধ্যুষিত শহর মান্দালয়ে আন্দোলনকারীদের নেতা তায়জার সান জানান, "আগে রাজ্যভিত্তিক শাসনব্যবস্থাকে জাতিগত ঐক্যের ভাঙন হিসেবে দেখা হত… বার্মার মানুষরা মনে করেছিল ফেডারেল শাসনব্যবস্থা নিয়ে তাদের মাথা ঘামানোর কিছু নেই, এটা কেবল যারা বামার সম্প্রদায়ের নন, তাদের উদ্বেগের বিষয়। এখন আমরা সামরিক স্বৈরাচারের অধীনে বিচারবহির্ভূত গ্রেপ্তার, নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড এবং মারধোরের সম্মুখীন হচ্ছি। সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের অনুভূতিগুলো এখন আমরা বুঝতে পারছি। তাদের প্রতি আমাদের সহমর্মিতাবোধও বেড়েছে।"