আমরা লাইভে English রবিবার, জুন ২৬, ২০২২

লবিস্ট নয়, সরাসরি আলোচনায় জোর দিচ্ছি: মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

prothomalo-english_2020-07_78ef37b2-93ed-4ce3-b858-9b177e902983_D6VafLttMErohNSnGRm9lrKVmAqkosYBHjLYrBQU-1

যুক্তরাষ্ট্রে সরকারবিরোধী প্রচারণায় ৮ লবিস্ট ফার্মের পেছনে বিএনপি-জামায়াত মিলিয়ন ডলার ‘অবৈধ অর্থ’ ব্যয় করেছে বলে ফের দাবি করলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি। জাতীয় সংসদে এ নিয়ে কথা বলার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গতকাল বিকালে সংবাদ সম্মেলন ডেকে তিনি এ সংক্রান্ত ডকুমেন্ট গণমাধ্যমকে সরবরাহ করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনের সূচনাতে শাহরিয়ার আলম বলেন, এটা দীর্ঘ গল্প, আমি ছোট করে বলছি। কাল সংসদে বলেছি, আজ আপনাদের ডকুমেন্ট দিচ্ছি। এটা স্টেট ডিপার্টমেন্টের ওয়েব সাইটেও রয়েছে। পাবলিক ডকুমেন্টগুলোকে সাক্ষী করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখানে বিএনপির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ৩টি এবং জামায়াতের প্রতি সহমর্মী নিউইয়র্কের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৫টি মার্কিন লবিস্ট ফার্মের চুক্তির বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। সরকার তথা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের যে তিনটি লবিস্ট ফর্মের সঙ্গে চুক্তি করেছে বিএনপি, তার ডকুমেন্টে বিএনপির নয়া পল্টনের অফিসের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। ওই ৩ ফার্মকে তারা ৩ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আব্দুস সাত্তার নামের এক ব্যক্তি বিএনপির পক্ষে মার্কিন লবিস্ট ফর্ম ব্লু স্টার স্ট্র্যাটেজিক এলএমসির সঙ্গে ২০১৮ সালে একটি চুক্তি করেন। তাদের ১ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেন। তাছাড়া আরও দু’টি চুক্তি মোতাবেক তারা ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেন বলে তথ্য মিলিছে। জামায়াতের প্রতি সহমর্মী নিউ ইয়র্কের পিস অ্যান্ড জাস্টিস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মার্কিন ৫ লবিস্ট ফর্মের চুক্তিবদ্ধ হওয়া এবং লেনদেনের কিছু তথ্য পেয়েছেন দাবি করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ স্বাভাবিক বিষয়। এটা দেশটির আইনে অন্যায় নয়। প্রশ্ন হচ্ছে বিএনপি ওই অর্থ কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছে। তা অনুসন্ধানে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দিচ্ছি। আজই চুক্তির ডকুমেন্টগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো হবে। বিএনপির ঠিকানা ব্যবহার করে এ চুক্তিগুলো করা হয়েছে। তাই ধরা যায় এ চুক্তি করতে বিএনপিই অর্থ ব্যয় করেছে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে অর্থ পাঠিয়েছে কিনা- তা জানা জরুরি। তাছাড়া বিএনপি এই ব্যয়ের হিসাব নির্বাচন কমিশনে দিয়েছে কি-না? সেটাও নিশ্চিত হওয়া দরকার। অর্থের উৎস সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং নির্বাচন কমিশনও খতিয়ে দেখতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিএনপির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠানোর কথা বললেও লবিস্টের পেছনে জামায়াতের অর্থায়ন নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর কণ্ঠে ছিল ভিন্ন সুর। এর কারণ ব্যাখ্যায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, তাদের পক্ষে নিউ ইয়র্কের পিস অ্যান্ড জাস্টিস চুক্তি করেছে।

চুক্তিতে জামায়াতের কথা আছে, কিন্তু দলটির অফিসের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়নি। তাছাড়া তারা কীভাবে অর্থ সরবরাহ করেছে তা স্পষ্ট নয়। তাই এ বিষয়ে আরও ডকুমেন্ট খোঁজা হচ্ছে। তাদের প্রতি সরকার কোনো ছাড় দিচ্ছে না দাবি করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখানে বিএনপি বা জামায়াতকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে না। তাদের ডার্টি মানির খোঁজ চলছে। ডকুমেন্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ৫টি লবিস্ট ফর্মের সঙ্গে পিস অ্যান্ড জাস্টিস নামে যে অর্গানাইজেশন চুক্তি করেছে তা জামায়াতেরই প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে সরকার নিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্রে ইতিবাচকভাবে বাংলাদেশ এবং সরকারের কার্যক্রমকে তুলে ধরতে সরকার পাল্টা লবিস্ট নিয়োগ করেছে মর্মে যে তথ্য প্রচারিত হয়েছে তার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার টানা ৩ টার্মে ক্ষমতায় আছে। আমরা কোনো লবিস্ট নিয়োগ করিনি। আমরা যেটা করেছি তা হলো পিআর।

লবিস্ট আর পিআর ফার্ম দু’টি আলাদা দাবি করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে একটি পিআর প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছে। এটি ওয়াশিংটনভিত্তিক, নাম বিজিআর। গত বছর বিজিআর বাংলাদেশের কাছ থেকে ত্রৈমাসিক ৮০ হাজার ডলার করে পেয়েছে, বছরে যার পরিমাণ ৩ লাখ ২০ হাজার ডলার (আনুমানিক ২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা)। পিআর বা লবিস্ট যে নামেই হোক যুক্তরাষ্ট্রে ‘লবিং পলিটিক্স’-এ কী তাহলে বিএনপি-জামায়াতের কাছে সরকার হেরে গেল? এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, না তা নয়, আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, বিএনপি জামায়াতের অবৈধ অর্থের কাছে আমরা পরাজিত হয়েছি এটা মনে করি না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্রিয়তা এবং পেশাদারি কূটনৈতিক কর্ম সত্ত্বেও কীভাবে বিএনপি-জামায়াত যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভুল’ বোঝাতে সক্ষম হলো? এবং র্যাবের ৭ অফিসারের বিরুদ্ধে জারি হওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রশ্নে বাংলাদেশ এখন কোন পথে এগুবে? এমন একাধিক জিজ্ঞাসার জবাবে প্রতিমন্ত্রী কথা বাড়াতে রাজি হননি। আজ কেবলই বিএনপি-জামায়াতের অপপ্রচার নিয়ে কথা বলতে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, র্যাব এবং নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আলাদাভাবে অন্যদিন বলবো। আজ শুধু এটুকু বলবো- আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এনগেজ রয়েছি। আমি মনে করি সরাসরি আলোচনায় এর সুফল আসবে। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের বুঝতে সক্ষম হবে। তাহলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারির পর যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগের যে ঘোষণা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন দিয়েছিলেন তা থেকে কি সরকার সরে আসছে? এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রী কি বলেছিলেন তা আমার খেয়াল নেই।

আদৌ তিনি লবিস্ট নিয়োগের কথা অন রেকর্ড বলেছিলেন কি-না? এমন প্রশ্নে রেখে তিনি বলেন, লবিং নয়, বরং আমরা সরাসরি আলোচনাতেই জোর দিচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্রে যে ‘পিআর’ ফর্মের সঙ্গে সরকার কাজ করছে তার মেয়াদ তো আগামী মার্চে শেষ হতে যাচ্ছে। সরকার কি তাহলে চুক্তি নবায়ন করবে না? এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা তাদের কাজগুলো পর্যালোচনা করবো। ফলদায়ক না হলে রিভিউ করবো। নিজের সংবাদ সম্মেলন ডাকার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কয়েক বছর আগে এ রকম একটি তথ্য আমি শেয়ার করেছিলাম। অতি সম্প্রতি আমরা আরও কিছু মিথ্যাচার দেখছি বিএনপি-জামায়াতের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছে বাইরে থেকে এমন কিছু মিডিয়ার। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তারা অঙ্গুলি নির্দেশ করছে যে, বাংলাদেশ লবিস্ট ইউজ করছে বা করবে। যদিও লবিস্ট নিয়োগ করা মার্কিন প্রশাসনের নিয়মাবলির মধ্যে পড়ে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এটা করে তারা কিন্তু পরে অস্বীকার করে। যেমন আপনারা দেখেছেন, খালেদা জিয়া লিখেছেন, পরে অস্বীকার করেছেন। তাই আজ আমি আপনাদের ডকুমেন্ট দিতেই ডেকেছি। তাছাড়া অনেকে আগ্রহও দেখিয়েছেন আমাকে পেতে।

আওয়ামী লীগ সরকার ও দেশবিরোধী প্রচারণায় যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপি-জামায়াতের লবিস্ট নিয়োগ সংক্রান্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সরবরাহ করা ডকুমেন্টে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কয়েক চিঠিও সংযুক্ত রয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে উন্নয়ন সহায়তা নিয়ে আলোচনা সংক্রান্ত একাধিক বৈঠকের চিঠি রয়েছে এখানে। এ থেকে আমরা ধারণা করতে পারি বিএনপি সরকারের পক্ষে আলোচনার জন্য বৈঠক চায়নি বরং বিরুদ্ধে কথা বলতেই তারা বৈঠক করেছে। এই চিঠিপত্র তার প্রমাণ। প্রতিমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আইনে এসব চুক্তি বা লবিংয়ের অনুমোদন রয়েছে। তবে এই অর্থের উৎস কি তা খতিয়ে দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাই। কারণ জঙ্গি অর্থায়নের সঙ্গে বিএনপি-জামাতের এই অর্থের সম্পর্ক থাকতে পারে। কারণ এটা সবাই জানে বিএনপি-জামাতের সময় দেশে জঙ্গিবাদের ব্যাপক উত্থান ঘটেছিল। তিনি আরও জানান, ২০১৩-১৪ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা তথ্যসম্বলিত’ প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচার শুরু করে বিএনপি জামায়াত। তখন এসব অপপ্রচারমূলক প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছাপানো এবং বাংলাদেশের অগ্রগতি, উন্নয়ন সম্পর্কে সঠিক তথ্য তুলে ধরার জন্য সরকার যুক্তরাষ্ট্রে একটি পিআর প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেয়। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর লেখা ছাপা হয়েছে। এই পিআর প্রতিষ্ঠানকে দেশের কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম ভুলভাবে লবিস্ট ফার্ম হিসেবে তুলে ধরেছে। প্রকৃতপক্ষে সরকার কোনো লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেনি। লবিস্ট ফার্ম অপপ্রচারের জন্য বিএনপি-জামায়াতই নিয়োগ করেছে।

অপপ্রচারকারীদের পাসপোর্ট বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়নি: এদিকে অন্য এক প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম জানান, বিদেশে বসে দেশের বিরুদ্ধে যারা অপপ্রচার চালাচ্ছেন তাদের পাসপোর্ট বাতিলের সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তবে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়ক জাতীয় কমিটিতে প্রস্তাব আকারে উঠেছিল। এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ওই বৈঠকের খবরকে আশ্রয় করে বাংলাদেশের মান মর্যাদাকে খাটো করে কেউ কেউ বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের নতুন আবেদন করতে পারেন এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করে শাহরিয়ার আলম বলেন, শাহবাগ আন্দোলনের পর বিদেশে গিয়ে আশ্রয় নেয়ার একটি ট্রেন্ড চালু হয়েছে। প্রকৃত ভুক্তভোগী ছাড়াও অনেকেই সে সময় নিজের সুবিধার জন্য দেশের বিরুদ্ধে কথা বলে বিদেশে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেছেন। কিছু হলেই অনেকে দেশের বিরুদ্ধে কথা বলে কয়েকটি রাষ্ট্রে আশ্রয় নেয়ার সুযোগ খোঁজেন। গত ১২ই জানুয়ারি সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, বিদেশে বসে যারা দেশের বিরুদ্ধে প্রচার চালাবে, তাদের পাসপোর্ট বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে।